উত্তর কোরিয়া - দক্ষিণ কোরিয়া বিভক্ত হয়েছিল কেন?

দুই প্রতিদ্বন্দ্বী সুপারপাওয়ার সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ঠাণ্ডা যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির অপ্রত্যাশিত ফলাফল হিসেবে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া ৭০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিভক্ত হয়ে আছে, শুধু বিভক্ত হয়েই ক্ষান্ত হয়নি, চলেছে নানা উত্তেজনা এবং তা কখনো কখনো যুদ্ধের রূপ নিয়েছে। কিন্তু কেন এমনটা হয়েছিলো? কি কারনে আলাদা হয়ে আছে দুই কোরিয়া?  আজকের এই লেখা দুই কোরিয়া বিভক্তি নিয়েই , জানাবো বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর এবং পেছনের ইতিহাস।

তখনকার কথা যখন উত্তর দক্ষিন কোরিয়ার অস্তিত্ব ছিল না, ছিলনা কোন মিলিটারি ডিমারকেশন লাইন। কোরিয়া মূলত রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ছিল, ১৩৯২ সালে জেসন রাজবংশ প্রতিষ্ঠার পর থেকে কোরিয়া একক রাজতান্ত্রিক সম্রাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। জাতিতে কোরিয়রা অত্যন্ত একক এবং ঐক্যবদ্ধ ছিল।
 
উত্তর কোরিয়া আর দক্ষিণ কোরিয়া বিভক্ত হয়েছিল কেন?
বিভক্ত উত্তর-দক্ষিণ কোরিয়া

সাল ১৯০৫, জপানি-রুশো যুদ্ধের পর কোরিয়া দখল করে নেয় জাপান এবং ৫বছর পর কোরিয়াকে কলোনিতে পরিণত করা হয়। ৩৫ বছর কোরিয়া জাপানের কাছে পরাধীন অবস্থায় থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কোরিয়া ঔপনিবেশিক শাসনের হাত থেকে মুক্তি পায়। কিন্তু, মুক্তির পাশাপাশি তারা বিভক্তও হয়ে যায় এই সময়ে, ঠিক যেমন হিন্দুস্তান কে বিভক্ত করা হয়েছিল পাকিস্তান এবং ভারত নামক দুইটি রাষ্ট্রে, যা পরবর্তীতে ৩টি রাষ্ট্রে পরিণত হয় এবং বাংলাদেশের জন্ম নেয়।

ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইস্ট এশিয়ান স্টাডিজ অ্যান্ড হিস্ট্রির অধ্যাপক এমিরেটাস মাইকেল রবিনসন বলেছেন,

"অনুঘটকের ঘটনাটি ঘটেছে সত্যিকার ভাবে, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে জড়িত কোরিয়ানরা ছাড়া কোরিয়াকে দুটি পেশা অঞ্চলে বিভক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিলো।"

কেন কোরিয়া বিভাজিত হয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে কোরিয়া থেকে জাপানকে উৎখাত করতে দুই পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্র একসাথে ঝাপিয়ে পড়ে। কোরিয়ার দক্ষিন দিক থেকে আক্রমণ করে আমেরিকান সেনাবাহীনি এবং কোরিয়ার উত্তর দিক থেকে আক্রমণ করে সোভিয়েত কমিউনিস্ট এর রেড আর্মি। ১৯৪৫ সালে আমেরিকা এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের যৌথ বাহিনীর কাছে জাপানী বাহিনী আত্মসমর্পণ করে।

১৯৪৫ সালের আগস্ট মাসে কোরিয়াকে মুক্তকারী দুই দেশ কোরিয়াকে ২ভাগে বিভক্ত করে ফেলে এবং নিজ নিজ শাসন প্রতিষ্ঠার কাজ চালায়। ৩৮° রেখার উত্তর দিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন সেনাবাহিনী কমিউনিস্ট শাসন ব্যবস্থা চালু করে এবং দক্ষিণ দিকে আমেরিকার সামরিক সরকার গঠিত হয়।

শ্রমিক এবং কৃষকদের কাছে সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট নীতি জনপ্রিয়তা লাভ করে, কিন্তু কোরিয়ান মধ্যবিত্তরা দক্ষিণে পালিয়ে যায়।

১৯৪৮ সালে আমেরিকা কোরিয়া উপদ্বীপের ভবিষ্যৎ ঠিক করার জন্য সকল কোরিয়াবাসীকে ভোটের আহ্বান জানায়, কিন্তু কোরিয়ার উত্তর অংশের জনগণ ভোটে অংশগ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। কিন্তু দক্ষিণ অংশ এ সুযোগ লুফে নেয় এবং কমিউনিস্ট বিরোধী সিংম্যান-রি এর নেতৃত্বে শক্তিশালী সরকার গঠণ করে।

উত্তর কোরিয়ার জনগণ ভোট প্রত্যাখ্যান করলেও ঘোষনা অনুযায়ী পুরো কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কথা ছিল সিংম্যান-রি এর। কিন্তু জোসেফ স্টালিন উত্তর অংশের প্রধানমন্ত্রী হসেবে কিম ইল-সাংক কে নিয়োগ দেন।

 

কোরিয়ান যুদ্ধ

উত্তর কোরিয়া এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় দুই সরকার থাকায় মতভেদ শুরু হতে থাকে, যে কোন সরকার সত্যিকারভাবে কোরিয়ার প্রতিনিধিত্ত্ব করে। এই প্রশ্ন সামনে রেখেই মূলত যুদ্ধের সূচনা হয়। এই যুদ্ধের মাধ্যমে উত্তর কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চূড়ান্তভাবে শত্রুতা শুরু হয়। কারণ, দু্ই কোরিয়ার মাঝে যখন যুদ্ধ শুরু হয়, তখন মার্কিন সেনারা কোরিয়া উপদ্বীপের উ্তর দিকের গ্রাম এবং শহরে বোমা বর্ষণ করে। তাছাড়া পূর্ব থেকেই মার্কিন সমর্থন ছিল দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতি। ১৯৫০ সালে শুরু হওয়া কোরিয়া যুদ্ধ ১৯৫৩ সালে আনুষ্ঠানিক কোন চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়। প্রত্যেক সরকারই নিজেদেরকে একমাত্র বৈধ সরকার বলে ঘোষণা করে। কোরিয়া যুদ্ধে প্রায় ২৫লক্ষ মানুষ নিহত হয় এবং দুই কোরিয়া বিভক্তি অব্যাহত থাকে।

সন্ন্যাসী রাজ্য বা হারমিট কিংডম

ইউরোপ এবং অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যমে দক্ষিণ কোরিয়া একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ান নাগরিকদের জীবনমান এবং সুযোগ সুবিধা প্রদানে অনেকটাই সফল। অন্যদিকে উত্তর কোরিয়াকে বলা যায় পৃথিবী থেকে একটি বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র। বিশেষ করে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে উত্তর কোরিয়া আইসোলেটেড হয়ে পড়েছে, বৈদেশিক সকল সুবিধা আসা প্রায় বন্ধ হয়ে পড়েছে। পারমাণবিক কর্মসূচীর কারণে উত্তর কোরিয়া পশ্চিমাদের রোষানলে পরে আরো বেশি পিছিয়ে যাচ্ছে।


শেষকথা: 

জাপানের শাসণ থেকে কোরিয়া মুক্তিই কোরিয়া বিভক্তির কারণ হয়ে দাড়িয়েছেল তবে কোরিয়া বিভাজন চূড়ান্ত হয়ে যায় মূলত কোরিয়া যুদ্ধের মাধ্যমে। দুই কোরিয়া সম্প্রীতি বজায় রাখতে অনেক সময় চেষ্টা করে হলেও তা এখনো সফলতার মুখ দেখেনি। দুই কোরিয়াকে এক করতে আমিরেকা এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের যৌথ প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়ে যায়। তারপরেও দুই কোরিয়ার নাগরিকরা স্বপ্ন দেখেন একদিন কোরিয়া বিভক্তির সমাপ্তি হবে যেখানে থাকবে না কোন মিলিটারি ডিমারকেশন লাইন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য